আমি পাপ করেছি বলেই, পূর্ণের এত কাছে যেতে চাই।


পাপে নেই কোনো গৌরব, নেই কোনো বিজয়, নেই কোনো দ্যুতি। তাতে দেখা যায় কেবল ভাঙা রেখা, বিবৰ্ণ ছায়া আর বিকৃতি। সেই বিকৃতির সামনে দাঁড়িয়েই মানুষ বোঝে সৌন্দর্যের মূল্য কতখানি। পাপ আমাকে হারিয়েছে, কিন্তু হারিয়েই আমি খুঁজেছি ফিরে পাওয়ার পথ।

পাপের গভীরে নামলে মানুষ বুঝতে পারে তার দম বন্ধ হয়ে আসা অন্ধকার কত ভয়াবহ। আর সেই অন্ধকারই তাকে ঠেলে দেয় আলোর দিকে। অগ্নিদগ্ধ মানুষ যেমন ছুটে যায় জলের কাছে, তেমনি আমি পাপের দাহে ছুটে যাচ্ছি পূণ্যের ছায়ায়। আমার ভেতরে এক শূন্যতা জেগেছে, আর সেই শূন্যতারই আকুতি আমাকে নিয়ে যাচ্ছে দয়ার উৎসের দিকে।

আমি পূণ্য চাইনি কখনো গর্বের অলংকার হিসেবে। চাইনি তার নামে মানুষের প্রশংসা, চাইনি কোনো সোনালী মুকুট । পূণ্যকে আমি চাই আত্মার আর্তি হিসেবে, সেই অশ্রুজলে ধোয়া ব্যথিত অন্তরের মুক্তি হিসেবে। আমি পূণ্য চাই, কারণ পাপের কাঁটার আঁচড়ে আমার হৃদয় থেকে রক্ত ঝরেছে। আমি পূণ্য চাই, কারণ তাতে আমার ক্ষত শুকাবে, আমার দাগ পবিত্র হয়ে উঠবে।

কখনো মনে হয়, পাপ এক সেতু। সেতুটি আমাকে ঠেলে দিয়েছে গভীর খাদে, কিন্তু সেই খাদে পড়ে আমি আকাশের দিকে তাকাতে শিখেছি। আকাশের নীল এখন আমার কাছে কেবল রঙ নয়, এটি এক আহ্বান। পবিত্রতার, শুদ্ধতার, অনন্তের আহ্বান। আমি পাপ করেছি বলেই, আমার চোখে পূণ্য আজ নক্ষত্রের মতো ঝলমল করছে।

মানুষের অন্তর কখনো নিখুঁত হয় না। তাতে দাগ থাকে, ক্ষত থাকে, রক্তক্ষরণ থাকে। কিন্তু সেই ক্ষতই মানুষকে অনুভব করায় সে বেঁচে আছে, সে ভুল করেছে। তাই তার প্রয়োজন ক্ষমা, প্রয়োজন পুনর্জন্ম। আমার পাপ আমার কাছে শেকল নয়; এটি আমার মুক্তির দরজা। প্রতিটি পাপ এক একটি ধাক্কা, যা আমাকে ঠেলে দিচ্ছে পূণ্যের দিকে।

আমার মনে হয়, যারা কেবল পূণ্যের পথে হাঁটে, তারা অনেক সময় তার গভীরতা বুঝতে পারে না। কারণ তারা অন্ধকারের স্বাদ জানে না, তারা অগ্নিদাহের কষ্ট বোঝে না ৷ কিন্তু পাপী, পাপের আঁধার ছুঁয়ে আসা মানুষের চোখে পূণ্য এক অমূল্য মুক্তো হয়ে ওঠে। আমি সেই মুক্তো চাই ।

পাপ আমাকে নম্র করেছে। আমাকে শিখিয়েছে, আমি কত ক্ষুদ্র, কত ভঙ্গুর। অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে আমার মধ্যে। তাই এখন পূণ্যকে আমি চাই না অর্জন হিসেবে, চাই আশ্রয় হিসেবে। যেমন ঝড়ের পর নৌকাডুবি যাত্রী বাঁচতে চায় কেবল একটি কাঠের টুকরোয় ভর দিয়ে, আমি তেমনি বাঁচতে চাই পূণ্যের আঁচলে ভর দিয়ে।

আমি পাপ করেছি বলেই, পূণ্য আমার কাছে গন্তব্য নয়। এটি আমার বেঁচে থাকার শ্বাস, আত্মার আশ্রয়, অস্তিত্বের সান্ত্বনা। পাপ আমাকে ধ্বংস করতে পারেনি, বরং পূণ্যের প্রতি আমার আকাঙ্ক্ষা জন্ম দিয়েছে। তাই আমি পাপের দুঃখকেও ধন্যবাদ জানাই।

আমি জানি মানুষ পূণ্য দিয়ে নয়, ক্ষমা দিয়ে রক্ষা পায় । আর ক্ষমা কেবল তাদেরই জন্য, যারা ভুল করেছে, যারা অন্ধকারে হেঁটেছে। আমি সেই অন্ধকারে হেঁটেছি। তাই আজ পূণ্যকে আমি দেখি না এক কঠোর শাসক হিসেবে, দেখি তাকে দয়ার কোলে নিদ্রিত শিশুর মতো।

আমি পাপ করেছি বলেই, পূণ্য আমার হৃদয়ে আজ নদীর মতো বয়ে চলেছে। তার জল আমার ক্ষত ধুয়ে দিচ্ছে। আমি তার শান্ত, স্নিগ্ধ, অনন্ত ধ্বনি শুনছি। এবং সেই ধ্বনির ভেতরেই আমি খুঁজে পাচ্ছি আমার অস্তিত্বের মুক্তি ।

আমার লিখাটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা আপনি আমাকে জানাতে পারেন। আপনার একটা মতামত আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা প্রধান করে। ধন্যবাদ।

Previous Post Next Post