শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিরুপদ্রব আকাশ হঠাৎ একদিন ছিঁড়ে যায় মানুষের লোভের ধারালো চিঁড়ে, পৃথিবীও আজ তার নীলচে শ্বাসের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে এক অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস৷
এক গভীর, খুব ক্ষীণ আর্তনাদ ৷
মানুষ বলে বয়স বাড়লে জমিনের হাড়ে ব্যথা ধরে, নদীর গায়ে ভাঁজ পড়ে, বনের দেহে ক্লান্তি আসে।
কিন্তু সত্যি কি তাই?
পৃথিবী তো অসীম; সে সময়ের নয়, সময়ই তার সন্তান । তাহলে কে তাকে ক্লান্ত করল?
মানুষ! দাবি করে তারা সৃষ্টির সেরা, আবার তারাই সর্বনাশের নকশাকার।
পৃথিবীর ক্লান্তি বয়সের দাগ নয়; এটা নৈতিকতার ক্ষয় । যেমন নদীর জল শুকিয়ে যায় অতিরিক্ত আহরণের ক্ষুধায়, তেমনি মানুষের অন্তহীন দখল সব কিছুর ওপরের লোভ একেকটি ফাটলের মতো ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর ত্বকে।
কখনো কখনো মনে হয়, পৃথিবীটা যেন এক বৃদ্ধা মা যার সন্তানরা তার কোলে জন্ম নিয়ে বড় হয়েছে, কিন্তু এখন তার কোলেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
মায়ের দেহ পুড়লে সন্তান কি অমর থাকে?
কিন্তু মানুষ ভাবে সে পৃথক ।
সে ভাবে আকাশের ধোঁয়া তার নয়, সমুদ্রের বিষাক্ত আঁধার
তার নয়, বনের শূন্যতা তার নয়।
এ যেন অন্ধ অহংকারের অপমানে তৈরি এক অদ্ভুত অচেতনতা।
আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় নীলের ভেতর জমে আছে অসংখ্য অপ্রকাশিত চিৎকার, যেন তারা বলছে, “তোমরা আমাদের দিকে তাকাও, তোমাদের পাপ থামাও, আমাদের বাঁচাও।”
কিন্তু মানুষ ব্যস্ত নিজের প্রতিচ্ছবি পালিশ করতে। তারা ভাবছে আয়নার আলোই সত্য, পৃথিবীর আলো নয় ।
কখনো কখনো সন্ধ্যার সময়, যখন সূর্য খুব ধীরে ডুবে যায়, তখন মনে হয় সে ক্লান্ত। তার কাজ শেষ হয়নি, আলো এখনও বাঁচতে চায়, তবু সে তাড়াহুড়ো করে না । কারণ সে জানে, যে পৃথিবীকে আলোকিত করে আসে, সেই পৃথিবিই আজ নিজের শিশির-ফাটা চোখে অবসাদ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক ঝলক দুঃখ নিয়ে এক ঝলক অপরাধবোধও। মানুষের পাপ মানে মানুষীয় অন্যায় নয়, পাপ মানে
অচেতনতা, পাপ মানে অবহেলা করা পাপ মানে পৃথিবীকে নিজের থেকে আলাদা ভাবা পাপ মানে এমনভাবে বাঁচা, যেন আমরা অতিথি নই, বরং জোর করে দখল নিতে আসা কোনো অবৈধ যাত্রী।
একসময় মানুষ মাটিকে ছুঁয়ে বলত, “তুমি মা।” আজ মানুষ মাটিকে ছুঁয়ে দেখে, “এটা সম্পত্তি।” এ একটি ক্ষুদ্র পরিবর্তন নয়; এটা অস্তিত্বের শিকড়ে আঘাত।
যে বন্ধন ছিল ভালোবাসার, তা হয়ে গেছে দখলের রজ্জু।
পৃথিবী তাই অদ্ভুত ভাবে নীরব হয়ে গেছে।
এই নীরবতা কোনো শান্তির লক্ষণ নয়, এ এক অপেক্ষা
এক গভীর, ঠাণ্ডা প্ৰতীক্ষা ।
যেন সে মানুষের হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে, “আর কত?”
মানুষ হয়তো সেই প্রশ্ন শোনে না, কিন্তু বাতাস শোনে।
বাতাস মাঝে মাঝে খুব অস্থির হয়ে ওঠে,
জোরে বইতে থাকে, অকারণে গর্জে ওঠে।
মানুষ ভাবে ঝড়-তুফান
কিন্তু ওটা আসলে এক দীর্ঘদিনের জমে থাকা চিৎকার ;
পৃথিবীর ক্লান্ত কণ্ঠে উচ্চারিত।
এমনকি নীরব নিস্তব্ধ রাত্রিও জানে এই ক্লান্তির কথা। রাত্রি কখনো কখনো অতিরিক্ত অন্ধকার হয়ে পড়ে,
আলোকে আড়াল করে মানুষকে থামাতে চায়, বলতে চায়, “তোমরা একটু থামো। শুনো। দেখো।”
কিন্তু মানুষ আলো খুঁজেও অন্ধকার বোঝে না
শেষমেশ প্রশ্ন আসে, পৃথিবীর ক্লান্তি কি চিরস্থায়ী?
না ।
পৃথিবী বিশাল, সময়ের চেয়েও প্রাচীন, মানুষের চেয়েও
ধৈর্যশীল।
সে আবার নবীন হতে পারে, আবার পুনর্জন্ম নিতে পারে ।
প্রশ্ন শুধু, মানুষ কি পারে?
মানুষ কি পারে ফিরে যেতে সেই পুরোনো সম্মানে,
যেখানে পৃথিবী ছিল মা, আমরা ছিলাম তার সন্তান?
মানুষ কি পারে নিজের অহংকার নামিয়ে রেখে মাটির দিকে
তাকাতে সেই পুরোনো বিনয়ের চোখে?
কারণ পৃথিবী ক্লান্ত, কিন্তু পৃথিবী এখনও ক্ষমাশীল।
তবে ক্ষমা শুধু শব্দে নয়, চায় পরিবর্তনে।
চায় মানুষের ভিতরের সেই নীরব আলো, যা একদিন তার জন্ম দিয়েছিল, আজ যা হারিয়ে গেছে লোভের ধুলোয়।
পৃথিবী ক্লান্ত ।
কিন্তু মানুষের হৃদয় যদি জাগে, একদিন পৃথিবী আবার নবীন হবে। আর তার শ্বাস হবে নীল, আবারও শান্ত, আবারও পবিত্র।