সময় হয়েছে, এখন জেগে ওঠো


“জীবন আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখে, আর মৃত্যু এসে বলে: 'সময় হয়েছে, এখন জেগে ওঠো।”

এক অতল, মায়ামণ্ডিত নিদ্রার কোলে আমরা ঘুমিয়ে আছি, যেখানে সময়ের স্রোত নিঃশব্দে বয়ে যায়। দেহ নড়ে-চড়ে, যেন জীবনের মঞ্চে এক অভিনেতা; মুখে কথার ঝর্ণা বহে, চোখে আলোর নৃত্য মায়াবী ছায়া ফেলে। এক গভীর, মোহময় স্বপ্নরাজ্যে তবু আমরা নিদ্রিত, যার নাম আমরা দিয়েছি 'জীবন'।

কবির কলমে এ জীবন এক নিঃশব্দ স্বপ্নের নদী, যার তীরে আমরা পথিক, কিন্তু গন্তব্যের মানচিত্র হারিয়ে ফেলেছি কবে! আমাদের হাসি যেন মরুভূমির মরীচিকা, ক্ষণস্থায়ী, ভঙ্গুর; কান্না যেন চোখের জলে রচিত এক নীরব নাটক। আমরা ব্যস্ত, দিনরাত ছুটে চলি সময়ের পিছনে। আমরা ক্লান্ত, জীবনের ভারে নুয়ে পড়ি; আনন্দে উদ্ভাসিত, বিষাদে নিমজ্জিত। কিন্তু অন্তরের গহনে, কোথাও এক অদৃশ্য কুয়াশা ঘুমের রাজ্য জড়িয়ে রাখে। এ ঘুম নয় শুধু চোখের পাতার আড়াল, নয় বিশ্রামের নম্র আশ্রয়, এ এক বিভ্রমের জাল, যেখানে 'আমি' শব্দটি দেহের ছায়ামাত্র ধরে,

আত্মার অমোঘ সত্তাকে ভুলে যায় ।

আমরা আয়নার সামনে দাঁড়াই, মুখের রেখায় খুঁজি নিজের পরিচয়। কিন্তু আত্মার অলিখিত চিত্রপট কোথায়? আমরা স্পর্শ করি দেহের ত্বক, চুলের রেশম, পোশাকের রঙ, পদবির গৌরব, কিন্তু আত্মার অস্পর্শ স্ফুলিঙ্গে হাত রাখতে পারি না। যাকে আমরা বাস্তবতা বলি, তা যেন এক মায়ার দর্পণ। তাতে প্রতিফলিত হয় কেবল বাহ্যিক রূপ, অন্তরের অমৃত সত্য নয়। এ ঘুম এত গভীর, এত মায়াবী, যে জাগরণের ডাক অনেকের কাছে ভীতির ছায়া ফেলে।

জাগরণ মানে শূন্যতার মুখোমুখি হওয়া, অহংকারের স্বর্ণপ্রাসাদ ধসে পড়া, স্বপ্নের রঙিন পর্দা ছিন্নভিন্ন হওয়া। তবু, এক সন্ধক্ষণে মৃত্যু আসে, যেন ঘড়ির কাঁটা থমকে দাঁড়িয়ে নিশ্চুপ সুরে বলে, “এবার জাগো।” সেই মুহূর্তে ঘুমন্ত আত্মা ধীরে ধীরে বোঝে, যা ছিল ‘সর্বস্ব' মনে করে ছুটেছিল তার পিছনে, তা ছিল মরীচিকা মাত্র, ক্ষণিকের মায়া ।

মৃত্যু আমাদের প্রথম প্রভাত, সত্যিকারের জাগরণ। দেহ তখন মাটির বুকে শায়িত, ধূলির সঙ্গে মিশে যায়; আর আত্মা, যেন এক পথিক, ফিরে তাকায় তার অতীত নিদ্রার দিকে। যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখে; সে ছিল রাজা, ছিল দীন, ভালোবাসা পেয়েছে, হারিয়েছে, জয়ের মুকুট পরেছে, পরাজয়ের ক্ষত বুকে বহেছে। কিন্তু সবই ছিল স্বপ্নের আলো-ছায়া, কিছুই ছিল না বাস্তব । মৃত্যুর সেই নির্মল প্রভাতে কেউ হাসে, কারণ তারা ঘুমের মাঝেই জাগরণের সাধনা করেছিল, আত্মার আলোয় পথ চিনেছিল। কেউ আবার কাঁদে, কারণ তারা কখনো জানতই না যে তারা নিদ্রিত ছিল, মায়ার জালে আবদ্ধ ছিল তাদের চেতনা।

তবু, এই ঘুমের গহনে কিছু ধ্বনি ভেসে আসে, যেন গভীর রাতে মাতালের কানে বাজে আজানের সুর, অথবা ভোরের পাখির কলতান। প্রেমের আহ্বান, যেন হৃদয়ের গভীরে এক মৃদু স্পন্দন; দুঃখের স্পর্শ, যেন আত্মার ঘুম ভাঙানোর তীক্ষ্ণ ঝাঁকি; মৃত্যুর সংবাদ, যেন সময়ের নির্মম সতর্কবাণী; কুরআনের পবিত্র শব্দ, যেন আলোর রশ্মি, ঘুমের কুয়াশা ভেদ করে আত্মার দুয়ারে কড়া নাড়ে।

এগুলো যেন সেই ঐশী ঝংকার, যা আমাদের নিদ্রিত চেতনাকে জাগাতে চায়, আমাদের ডাকে সত্যের পথে। কিন্তু আমরা কেমন পথিক? ঘুমন্ত অশ্বের মতো দৌড়াই, ছুটে চলি জীবনের পথে, তবু জানি না জাগরণের সত্য কী, গন্তব্য কোথায়। আমাদের পদচিহ্ন মাটিতে পড়ে, কিন্তু আত্মার পথে আমরা এগোই না।

আমরা যাকে জীবন বলি, তা কি সত্যিই জীবন? নাকি এক দীর্ঘ, মায়াময় নিদ্রা, যেখানে আমরা ভুলে যাই আমাদের আসল অস্তিত্ব? আমরা দেহের পিছনে ছুটি, কিন্তু আত্মার ডাক শুনি না। আমরা পদবির গৌরবে মুগ্ধ হই, কিন্তু আত্মার অমৃত আলোয় দৃষ্টি দিই না। জাগরণের পথ দুরূহ, কঠিন। কিন্তু তাতেই নিহিত আত্মার মুক্তি, সত্যের সন্ধান। প্রেম, দুঃখ, আধ্যাত্মিকতা এগুলো আমাদের নিদ্রাভঙ্গের সুর, আমাদের জাগরণের আহ্বান। শুনব কি আমরা সেই সুর? নাকি ঘুমন্ত অশ্বের মতো দৌড়ে চলব, গন্তব্যহীন, উদ্দেশ্যহীন?

জাগরণ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে না। জাগরণ এখানে, এই মুহূর্তে প্রতি নিঃশ্বাসে, প্রতি হৃৎস্পন্দনে। দরকার শুধু একটু থমকে দাঁড়ানো, একটু কান পাতা, একটু দৃষ্টি দেওয়া আত্মার অমৃত আলোর দিকে। যখন আমরা প্রেমের স্পর্শে কেঁপে উঠি, দুঃখের গভীরতায় ডুবে যাই, অথবা আধ্যাত্মিকতার সুরে হৃদয় জেগে ওঠে তখনই আমরা ঘুমের জাল ছিন্ন করি। তখনই আমরা দেখি, জীবন শুধু দেহের নয়, আত্মারও। তখনই আমরা বুঝি, আমরা যাকে বাস্তব বলি, তা কেবল মায়ার আবরণ; আর সত্য লুকিয়ে আছে আমাদের অন্তরের নিভৃত কোণে।

এই জাগরণ কোনো দূরের গন্তব্য নয়। প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পদক্ষেপে এটি একটি যাত্রা। যখন আমরা একটি ফুলের সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হই, একটি শিশুর হাসিতে হৃদয় পূর্ণ হয়, অথবা নিঃশব্দ রাতে নিজের সঙ্গে কথা বলি তখনই আমরা জাগরণের দিকে এগোই। যখন আমরা অন্যের দুঃখে সঙ্গী হই, প্রেমে নিজেকে উৎসর্গ করি, অথবা স্রষ্টার সান্নিধ্যে হারিয়ে যাই তখনই আমরা ঘুমের মায়া ভাঙি ৷

আমার লিখাটি পড়ে আপনার কেমন লেগেছে তা আপনি আমাকে জানাতে পারেন। আপনার একটা মতামত আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা প্রধান করে। ধন্যবাদ।

Previous Post Next Post